বিপন্ন নদীর বাঁধ, বেহাল রাস্তা – আতঙ্কিত গ্রামবাসী

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী

আপন বেগে পাগল পারা নদী ভূমির ঢাল অনুসরণ করে কুল কুলু শব্দ করতে করতে ছুটে চলে মোহনার দিকে সাগর বা অন্যকোনো নদীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ব্যতিক্রম দেখা যায়নি অজয় নদের ক্ষেত্রে। ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমির ঢাল অনুসরণ করে নদটি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কাটোয়ার কাছে মিশেছে গঙ্গা নদীর সঙ্গে। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় আউসগ্রাম-২ নং ব্লকের দেকুড়ি গ্রামে।

গ্রামের উত্তরে বীরভূম জেলা, দক্ষিণে পূর্ব বর্ধমান। এখান থেকে একটু পশ্চিমে অজয় নদে বাঁক আছে এবং ভূমির ঢাল কিছুটা দক্ষিণ দিকে হেলে। স্বাভাবিক নিয়মে নদীর স্রোত সরে এসেছে দক্ষিণ দিকে ও ধাক্কা দিতে থাকে মূল বাঁধে। যার আঘাতে বাঁধের অস্তিত্ব বিপন্ন। রাজ্য সেচদপ্তর পাথর দিয়ে বাঁধ রক্ষা করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বাঁধের উপর একাধিক জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে সুড়ঙ্গের। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে এই সুড়ঙ্গ বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে – আশঙ্কা গ্রামবাসীদের।

নদীর এপাড় ভাঙে, ওপাড় গড়ে নীতি অনুসরণ করে বীরভূমের দিক থেকে অজয় নদ পূর্ব বর্ধমানের দিকে তিনশ থেকে চারশ মিটার সরে এসেছে। বীরভূমের দিকে চড়া পড়লেও পূর্ব বর্ধমানের দিকের অনেক ক্ষেত জমি চলে গেছে অজয়ের গর্ভে। দূরে আঙুল তুলে প্রবীণদের বক্তব্য – কয়েক বছর আগে ওখান দিয়ে অজয় বয়ে যেত। আজ চলে এসেছে বাড়ির কাছাকাছি। এরকম চলতে থাকলে আগামী দিনে বাড়ির উঠানে চলে আসবে-‘দুয়ারে অজয়’। দীর্ঘশ্বাস পড়তে থাকে প্রবীণদের।

পরিস্থিতি সামাল দিতে নদীর স্রোতের হাত থেকে দক্ষিণ দিকের বাঁধ রক্ষা করার জন্য সেচদপ্তরের পক্ষ থেকে নদীর দক্ষিণ দিকে নদীর গর্ভ বরাবর কাঠের খুঁটি ও বালির বস্তা দিয়ে প্লাটফর্মের মত তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা একে বল্লি বা বল্লা বলে। লক্ষ্য এই প্লাটফর্মে ধাক্কা খেয়ে নদীর স্রোত যাতে বাঁধ থেকে উত্তর দিকে সরে যায়। পরিকল্পনা সফল হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ যথাযথ ভাবে প্লাটফর্মগুলো তৈরি করা হয়নি বলে জলের চাপে সেগুলির অধিকাংশ ভেঙে পড়েছে এবং কয়েক কোটি টাকা অজয়ের জলে ভেসে গেছে। এখানেও হয়তো দুর্নীতি!

এমনিতেই ‘নদীর পাড়ে বাস, ভাবনা বারো মাস’। তারপর সরকারি আধিকারিকদের এই ‘ম্যান মেড’ আতঙ্ক বর্ষাকাল এলেই নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭৮ সালের বন্যা এদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে এবং সেই স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। মনের মধ্যে দুঃস্বপ্নের দাগ থেকে গেছে।

এখানে আবার বাঁধের উপর বড় গর্ত ও সুড়ঙ্গ। সেটা ধীরে ধীরে নেমে গেছে গ্রামের দিকে। যার মধ্যে দিয়ে সহজেই জল গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে। দেখলে মনে হবে সুড়ঙ্গ যেন অজয় নদকে স্বাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। গর্তের সামনে কোনো বিপদ সঙ্কেত না থাকার জন্য রাতের অন্ধকারে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আবার বাঁধের দু’পাশে যেভাবে জঙ্গলের সৃষ্টি হয়েছে তাতে সাপ ও অন্যান্য আতঙ্ক মাথায় রেখে ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত করতে হয়।

পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আতঙ্কে গলা কেঁপে ওঠে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ইন্দ্রানীর। প্রশাসনের কাছে তার অনুরোধ - দয়া করে সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন। এটা কোন দপ্তরের কাজ সেটা আমরা জানিনা। আমরা কেবল স্থানীয় প্রশাসনকে চিনি। 

থানা, হাসপাতাল বা ব্লক অফিস যাওয়ার জন্য যে রাস্তাটি আছে বালিবাহী গাড়ি চলাচলের জন্য সেটি পুরোপুরি বেহাল। বৃষ্টি পড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। প্রত্যন্ত গ্রাম বলে প্রশাসনও যেন উদাসীন থাকে!

বাঁধের অবস্থা নিয়ে গ্রামবাসীরা নাকি একাধিক বার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছে। উত্তর পেয়েছে ওটা সেচদপ্তরের কাজ। সাধারণ মানুষতো সেসব বোঝেনা। প্লাটফর্ম তৈরি করার সময় তারা স্থানীয় প্রশাসনের মানুষদের তদারকি করতে দেখেছে।

জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহারের বক্তব্য – আমি নিজে এলাকার পরিস্থিতি দেখতে যাব। কীভাবে অসহায় মানুষের দুশ্চিন্তা দূর করা যায় সেটা নিয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

অতীতের হাজারো না-রাখা প্রতিশ্রুতির জন্য এসব কথা শুনে অবশ্য এলাকাবাসীর মন ভরেনা। বিধান, ছিদাম, আনন্দ, মনোজ, 

ইন্দ্রানী, ক‍ৃষ্ণমোহন ভ‍‍ৌমিকরা বাঁধের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেই বিনিদ্র রজনী কাটাতে বাধ্য হয়।

এখন দেখার অজয় নদের কাছাকাছি গ্রামের বাসিন্দা সদ্য মনোনীত জেলা পরিষদের সভাধিপতি যার প্রতিকূল পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে তার হাত ধরে কোনো উন্নতি হয় কিনা! কথা বলে বোঝা গেল এলাকাবাসীর তার উপর ভরসা আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *